রুপান্তর নিউজ রুপান্তর নিউজ
Admin
মেলার ৫০ হাজার টাকা ৫ মাসেও সরকারি কোষাগারে জমা হয়নি, মিঠাপুকুরে ইউএ নওর বিরুদ্ধে ইজারার অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ


রাষ্ট্রীয় ডাকাত নামে খ্যাত রংপুরের মিঠাপুকুরের নির্বাহী কর্মকর্তা দুর্নীতির অপকর্ম সম্পর্কে রাষ্ট্র সরকারের পক্ষে অজানায় রয়ে গেছে। তার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য জোর আহবান জানিয়েছে মিঠাপুকুরের সাধারণ জনগোষ্ঠী তার বিষয়ে একাধিক অনলাইন পত্রিকা প্রকাশিত হলেও এখন পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ হচ্ছে না তাই ভুক্তভোগীদের অভিযোগ তবে এই হ্যাপি বার্থডে আইনের আওতায় আনা হবে তাই অনেকের প্রত্যাশা।
রংপুরের মিঠাপুকুরে চারশো বছরের ঐতিহ্যবাহী গৌড় সাহা বারুণী মেলার ইজারার ৫০ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. পারভেজের বিরুদ্ধে। মেলা শেষ হওয়ার প্রায় পাঁচ মাস পরও অর্থটি সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে উপজেলা কার্যালয়ে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা। তবে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অস্বীকার করে ইউএনও বলেছেন, টাকা জমা হয়েছে কি না তা তাঁর জানা নেই; তিনি বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখবেন।
মিঠাপুকুর উপজেলার মিলনপুর ইউনিয়নে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে পহেলা বৈশাখে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে গৌড় সাহা বারুণী মেলা। সরকারি ইজারার মাধ্যমে আয়োজিত এ মেলা এবার অনুষ্ঠিত হয় ১৪ ও ১৫ এপ্রিল।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মেলা আয়োজনের আগে মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে ইজারার জন্য উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা দর দিয়ে ইজারা নেন মিলনপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আকমল হোসেন। পরে মেলা অনুষ্ঠিত হলেও ইজারার ওই ৫০ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার পরিবর্তে উপজেলার সংশ্লিষ্টদের পকেটে রেখেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এবিষয়ে বিএনপি নেতা আকমল হোসেন বলেন, মেলার ডাকে আমরা ৩জন অংশ নিয়ে ছিলাম, সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে আমি ইজারা পাই। ভ্যাট ট্যাক্সসহ সমুদয় টাকা তৎক্ষনাৎ বুঝে দেই। এর বেশী আমি কিছু বলতে পারবো না।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের উপসহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান জানান, উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে আকমল হোসেন ৫০ হাজার টাকায় মেলাটি ইজারা নেন এবং মেলা ইজারা দেওয়ার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আমাদের কাছে আছে। মশিউর রহমান বলেন, “টাকাটা অফিসে জমা আছে। এখনো সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি। অর্থবছরের মধ্যে জমা হবে। মেলাটি পূর্বের অর্থবছরের (২০২৫-২৬)।” ইজারার টাকা জমা দেওয়ার নির্দিষ্ট সময়সীমা আছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “ডাকের টাকা জমা দেওয়ার নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই। আমরা যেকোনো সময়ে জমা করতে পারি।”
তবে সরকারি বিধিমালায় এর ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। হাট ও বাজার (স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা) বিধিমালা, ২০২৫-এর বিধি ১৫(২) অনুযায়ী, ধর্মীয় বা অন্য কোনো বিশেষ উৎসব উপলক্ষে স্বল্পমেয়াদি অস্থায়ী হাট-বাজারের ইজারালব্ধ অর্থ (ভ্যাট ও আয়কর ব্যতীত) ইজারা প্রদানের সাত কার্যদিবসের মধ্যে ২০ শতাংশ অর্থ সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক কোডে সরকারের অনুকূলে জমা দিতে হবে। অবশিষ্ট ৮০ শতাংশ অর্থ উপজেলা ক্ষেত্রে উপজেলা রাজস্ব তহবিলে জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে।
একই বিধিমালার ১৫(১) অনুযায়ী, ধর্মীয় বা বিশেষ উৎসব উপলক্ষে স্বল্পমেয়াদি অস্থায়ী হাট-বাজার স্থাপনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট উপজেলা পরিষদ বা পৌরসভাকে জেলা প্রশাসকের পূর্বানুমতি নিয়ে বিধিমালা অনুসরণ করে ইজারা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়।
এ ছাড়া হাট ও বাজার (স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা) আইন, ২০২৩-এর ৪ ধারায় ধর্মীয় বা অন্য কোনো বিশেষ উৎসব উপলক্ষে অস্থায়ী হাট-বাজার স্থাপনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে জেলা প্রশাসকের পূর্বানুমোদন নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এসিল্যান্ড অফিসও জানে না ইজারার টাকা কোথায়! মিঠাপুকুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আশিক জামান জানান, প্রতিবছর পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে উপজেলার বিভিন্ন মেলা সরকারি অনুমোদন ও দরপত্রের মাধ্যমে আয়োজন করা হয়ে থাকে। ২০২৫ সালে চৌধুরী গোপালপুর মেলার ইজারার অর্থ ভ্যাট-ট্যাক্সসহ এসিল্যান্ড কার্যালয়ের মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব খাতে জমা দেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, ২০২৬ সালে বুড়াইল মেলা আয়োজনের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হলেও জেলা প্রশাসকের অনুমতি পাওয়া যায়নি। এরপর মিলনপুর ইউনিয়নের গৌড় সাহা বারুণী মেলা আয়োজনের বিষয়ে তাঁদের কার্যালয় থেকে কোনো প্রস্তাব পাঠানো হয়নি।
আশিক জামান বলেন, “এই মেলার জন্য আমরা কোনো প্রস্তাবই পাঠাইনি। এ কারণে এখানে যদি কোনো টাকা আদায় হয়ে থাকে, সে বিষয়টি আমি আজকেই আপনাদের মাধ্যমে জানতে পারলাম। টাকা কীভাবে আদায় হয়েছে বা কোথায় জমা হয়েছে, সে বিষয়ে আমার কোনো ধারণা নেই।”
অভিযোগের বিষয়ে মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. পারভেজ বলেন, “মেলার টাকা আমাদের উপজেলা রাজস্ব তহবিলে জমা হয়।” ইজারার টাকা কতদিনের মধ্যে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার নিয়ম রয়েছে, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “এটার ধরাবাঁধা কোনো নিয়ম নেই।” মেলার ৫০ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে কি না জানতে চাইলে ইউএনও বলেন, “এই মেলার টাকাটা জমা হয়েছে কি না আমার জানা নেই। এ বিষয়ে আমি খোঁজ নেব।”
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রংপুর জেলা সেক্রেটারি অধ্যাপক ফখরুল আনাম বেনজু বলেন, সরকারি ইজারার অর্থ গ্রহণ ও জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করা জরুরি। তাঁর মতে, রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যক্তিগত বা দাপ্তরিক হেফাজতে দীর্ঘদিন রেখে দেওয়ার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, “এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না হয়ে থাকলে বিষয়টি অবশ্যই তদন্তের দাবি রাখে। একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে রাষ্ট্রের অর্থ ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা তাঁর দায়িত্ব।” তিনি আরও বলেন, অভিযোগের বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে তদন্ত করে অনিয়ম প্রমাণিত হলে সরকারি চাকরির বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
সরকারি নথি ও প্রচলিত আইনের বিধান অনুযায়ী, হাট ও বাজার (স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা) বিধিমালা, ২০২৫-এর বিধি ১৫(২)-এ স্বল্পমেয়াদি অস্থায়ী হাট-বাজারের ইজারালব্ধ অর্থ জমা দেওয়ার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট অর্থ সরকারি কোষাগার বা উপজেলা রাজস্ব তহবিলে জমা না দেওয়ার বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। অন্যদিকে, কোনো সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ বা অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ তদন্তে সত্য প্রমাণিত হলে দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৪০৯ ধারা প্রযোজ্য হতে পারে। এ ধারায় সরকারি কর্মচারী কর্তৃক অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
তদন্তের আশ্বাস দিয়ে রংপুরের জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান বলেন, “এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে আমার কার্যালয়ের অন্য কর্মকর্তাদের নিয়ে তদন্ত করে ইউএনওর কাছে ব্যাখ্যা চাইব। কোনো অনিয়ম হলে অবশ্যই বিধি মোতাবেক বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এখন প্রশ্ন উঠেছে মেলার ইজারার ৫০ হাজার টাকা যদি সত্যিই আদায় হয়ে থাকে, তাহলে পাঁচ মাসেও তা সরকারি কোষাগার বা উপজেলা রাজস্ব তহবিলে জমা পড়ল না কেন? সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও সরকারি নথিপত্র যাচাই করে তদন্তের মাধ্যমে এর প্রকৃত কারণ উদঘাটনই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।


