প্রকাশিত: 9:41 PM, August 27, 2026


ইসরায়েলি বাহিনী গুলি চালিয়ে ঝাঁঝরা করেছিল সেই ছোট্ট হিন্দের গাড়ি, অবশেষে দায় স্বীকার

ইসরায়েলি বাহিনী গুলি চালিয়ে ঝাঁঝরা করেছিল সেই ছোট্ট হিন্দের গাড়ি, অবশেষে দায় স্বীকার

২০২৪ সালে গাজায় ৫ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি শিশু হিন্দ রাজাব ও তার পরিবারের সদস্যদের বহনকারী একটি গাড়িতে ইসরায়েলি সেনারা গুলি চালিয়েছিল। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বুধবার এ ঘটনা অবশেষে স্বীকার করেছে।

এ ছাড়া এ ঘটনায় একটি ফৌজদারি তদন্ত শুরু করার কথাও জানিয়েছে দেশটির সামরিক বাহিনী।
তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, এ ধরনের তদন্ত খুব কম ক্ষেত্রেই দোষীদের বিরুদ্ধে দণ্ড নিশ্চিত করতে পারে। হিন্দ রাজাবের নিহত হওয়ার ঘটনা গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের সময় বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর অন্যতম আলোচিত ঘটনা হয়ে ওঠে। ২০২৪ সালের ওই ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।

ঘটনার দিন হিন্দ রাজাব গাজার উত্তরাঞ্চলে পরিবারের ছয় সদস্যের সঙ্গে একটি গাড়িতে করে যাচ্ছিল। পথে গাড়িটিতে ইসরায়েলি বাহিনী গুলি চালালে পরিবারের অন্য সদস্যরা নিহত হন। শিশু হিন্দ রাজাবের গাড়িতে ৩৩৫টি গুলি চালিয়েছিল ইসরায়েল। গুলিতে ক্ষতিগ্রস্ত গাড়িটির ভেতরে একমাত্র হিন্দ তখনো জীবিত ছিল।

পরে সে ফোনে ফিলিস্তিনি প্যারামেডিকদের কাছে তাকে উদ্ধারের জন্য সাহায্য চায়।
প্যারামেডিকদের তখন ছোট্ট হিন্দ বলেছিল, ‘সবাই ঘুমিয়ে গেছে। আমার খুব ভয় করছে, আমাকে নিয়ে যাও।’

পরে হিন্দকে উদ্ধারের জন্য একটি অ্যাম্বুলেন্স পাঠানো হয়। কিন্তু অ্যাম্বুলেন্সটিও গুলির মুখে পড়ে।

পরে অ্যাম্বুলেন্সের দুই কর্মীও নিহত হন। ঘটনার ১২ দিন পর গাজার একটি এলাকায় গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া গাড়ির ভেতর থেকে হিন্দ রাজাবের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
হিন্দকে উদ্ধারের আগে প্যারামেডিকদের সঙ্গে তার ফোনে কথোপকথনের রেকর্ডিং প্রকাশ্যে আসে। সেখানে তার সাহায্যের আকুতি বিশ্বজুড়ে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। একই সঙ্গে গাজায় নিহত শিশুদের মৃত্যুর ঘটনায় জবাবদিহির দাবিও আরো জোরালো হয়।

হিন্দ রাজাবের ঘটনা নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘দ্য ভয়েস অব হিন্দ রাজাব’ ২০২৬ সালের অস্কারের জন্য মনোনয়ন পায়। হিন্দের মৃত্যু গাজায় বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা এবং ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের জবাবদিহি নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে ওঠে।

এর আগে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দাবি করেছিল, শিশুটি যেখানে নিহত হয়েছিল তার আশপাশে তাদের কোনো সেনা ছিল না। তবে বুধবার তারা জানায়, কয়েক মাস ধরে চলা অভ্যন্তরীণ তদন্তে নতুন তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তে জানা যায়, গাড়িটি ইসরায়েলি সেনাদের দিকে এগিয়ে আসার সময় সেনারা সেটিকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিল।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানায়, হিন্দ রাজাবকে উদ্ধারের জন্য পাঠানো ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্টের একটি অ্যাম্বুলেন্সে পরে একটি গোলা নিক্ষেপ করা হয়েছিল।

এক বিবৃতিতে সামরিক বাহিনী বলেছে, তদন্তের ফলাফল পর্যালোচনা করার পর তারা দেখতে পেয়েছে যে, ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্টের অ্যাম্বুলেন্সটির চলাচল সমন্বয়ের ক্ষেত্রে কিছু গুরুতর ত্রুটি বা ব্যর্থতা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে ঘটনাটির বিষয়ে ফৌজদারি তদন্ত শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সামরিক বাহিনী আরো জানায়, তাদের ‘ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং অ্যান্ড অ্যাসেসমেন্ট মেকানিজম’ ২০২৫ সালের মার্চে ১৫ জন জরুরি সেবাকর্মী ও ত্রাণকর্মী নিহত হওয়ার ঘটনাও ফৌজদারি তদন্তের আওতায় আনবে। তবে আরো তিনটি ঘটনায় ফৌজদারি তদন্ত শুরুর মতো যথেষ্ট কারণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে সামরিক বাহিনী। এর মধ্যে ২০২৪ সালের এপ্রিলে ত্রাণ সংস্থা ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের সাতজন ত্রাণকর্মী নিহত হওয়ার ঘটনাও রয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, ফিলিস্তিনিদের হত্যার ঘটনায় ইসরায়েলি সেনাদের বিরুদ্ধে তদন্ত হলেও খুব কম ক্ষেত্রেই দোষীদের বিচারের মুখোমুখি করা হয় বা শাস্তি হয়। হিন্দ রাজাবের মৃত্যু নিয়ে নির্মিত একটি চলচ্চিত্র ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার জিতেছে এবং পরে অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডের জন্যও মনোনীত হয়।

গাজা শহরের একটি বাস্তুচ্যুত মানুষের শিবিরে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হিন্দ রাজাবের নানি বলেন, তিনি এবং শিশুটির পরিবার ইসরায়েলের বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখেন না। তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি, সারা বিশ্ব থেকে ন্যায়বিচার আসবে। আমরা আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার কাছে ন্যায়বিচারের আবেদন জানাচ্ছি।’

ইসরায়েলি মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, ফিলিস্তিনিদের হত্যার ঘটনায় ইসরায়েলি সেনাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি তদন্ত হলেও খুব কম ক্ষেত্রেই অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। ইয়েশ দিন মানবাধিকার সংগঠনের গবেষক ড্যান ওয়েন বলেন, গত এক দশকে খুবই অল্পসংখ্যক তদন্তের ফল হিসেবে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। তার মতে, ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক চাপের কারণে স্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে ইসরায়েলি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো আরো নিরুৎসাহিত হচ্ছে।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বলছে, তাদের হামলার প্রধান লক্ষ্য হামাস ও হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা। তবে কোনো হামলায় বেসামরিক মানুষ, চিকিৎসাকর্মী, ত্রাণকর্মী বা সাংবাদিক নিহত হলে কিছু ক্ষেত্রে তারা তদন্ত শুরু করে।

২০২৩ সালে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানেও আরো কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ত্রাণকর্মী, চিকিৎসক, সাংবাদিকসহ বহু বেসামরিক মানুষ রয়েছে।

গত বছরের অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হলেও ইসরায়েলি হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ইসরায়েলের দাবি, হামাস ও গাজার অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর সম্ভাব্য হামলা ঠেকাতেই তারা এসব হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ২০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি এবং চারজন ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন।

Share this news as a Photo Card