রুপান্তর নিউজ রুপান্তর নিউজ
Admin
কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে ইন্টার্নদের কর্মবিরতি: স্থবির চিকিৎসাসেবা, নেপথ্যে উর্ধ্বতন কর্মকর্তার হাতে লাঞ্ছনার অভিযোগ

কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ওপর প্রশাসনিক লাঞ্ছনা ও চরম নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ তুলে শুরু হওয়া অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে পুরো হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ভেঙে পড়েছে।
বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত থেকে শুরু হওয়া এই অচলাবস্থার কারণে হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলো এখন কার্যত ডাক্তার শূন্য। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা শত শত রোগী ও তাদের স্বজনরা চরম মানবিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছেন।
জানা গেছে, বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক ১টার দিকে ডিউটিরত অবস্থায় ডি.এম.এফ ইন্টার্ন মো. ইমদাদুল হোসেনকে প্রশাসনিকভাবে হেনস্তা ও লাঞ্ছিত করার ঘটনা ঘটে। অভিযোগ উঠেছে, স্বাস্থ্য অধিদফতরের (DGHS) অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হান পরিদর্শনে এসে ব্যবস্থাপত্রে অ্যান্টিবায়োটিক লেখার কারণ দেখিয়ে ইমদাদুল হোসেনকে ‘ভুয়া ডাক্তার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, তিনি রোগীর স্বজনদের ডেকে এনে তাদের সাক্ষী রেখে ইমদাদুলকে পুলিশের হাতে তুলে দেন।
এই ঘটনার প্রতিবাদে এবং কর্মস্থলে নিরাপত্তার দাবিতে ‘ডি.এম.এফ ইন্টার্ন অ্যাসোসিয়েশন’ জরুরি সভার মাধ্যমে হাসপাতাল বর্জনের ঘোষণা দেয়।
নাম না প্রকাশ শর্তে একাধিক শিক্ষার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা এখানে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সেবা দিচ্ছি। অথচ আমাদের শেখানোর পরিবর্তে আমাদের সাথে অপরাধীর মতো আচরণ করা হচ্ছে। হাসপাতালের ডাক্তাররা যখন নিজেদের ব্যক্তিগত চেম্বার নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, তখন আমরাই দিনরাত রোগীদের আগলে রাখি। অথচ আমাদেরই লাঞ্ছিত হতে হচ্ছে।”
তারা আরও অভিযোগ করেন, হাসপাতালে ব্যাপক অনিয়ম চলছে যা প্রশাসনের নজরে আসে না। জরুরি বিভাগ ও আইসিইউ-র মতো সংবেদনশীল স্থানেও অনেক সময় ম্যাটস শিক্ষার্থী বা তথাকথিত ‘অনারারি’ ডিএমএফ দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন তোলেন—”যদি ইমদাদুল হোসেন ভুয়া ডাক্তার হয়, তবে আইসিইউতে অনারারি ডিএমএফ এবং ইমার্জেন্সিতে ম্যাটস শিক্ষার্থীরা কীভাবে কাজ করছে? হাসপাতালের ভেতর নন-মেডিকেল ব্যক্তি এবং সিএইচসিপি (CHCP) কর্মীরা ডিএমএফ সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছে, দালালদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে, সেদিকে কেন প্রশাসনের নজর নেই?”
শুক্রবার সরেজমিনে দেখা যায়, জরুরি বিভাগ ও আউটডোর কোনোমতে চালু থাকলেও অন্তর্বিভাগে (ওয়ার্ড) হ য ব র ল অবস্থা। গুরুতর অসুস্থ রোগীদের নিয়মিত রাউন্ড বা দেখাশোনা করার কেউ নেই। নার্সরা সাধ্যমতো চেষ্টা করলেও চিকিৎসকের অভাবে অনেক রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রোগীর স্বজন বলেন, “সকাল থেকে কোনো ডাক্তার নেই। হাসপাতালে দালাল আর পুলিশের ভিড় বেশি, কিন্তু চিকিৎসার লোক নেই।”
কর্তৃপক্ষের অবস্থান ও চাপা উত্তেজনা
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালকসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে কাজে ফেরানোর চেষ্টা করেছেন। তবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও ক্ষোভ বিরাজমান। বাধ্য হয়ে কেউ কেউ কাজে ফিরলেও সেবার স্বাভাবিক পরিবেশ এখনো ফেরেনি। তারা এই লাঞ্ছনার সুষ্ঠু বিচার ও লিখিত নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত পূর্ণোদ্যমে কাজে না ফেরার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
কুষ্টিয়ার প্রধান এই সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে প্রতিদিন ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ রোগী ভর্তি থাকে। সচেতন মহলের মতে, অতি দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে এই সংকট নিরসন না হলে সাধারণ মানুষের চিকিৎসাপ্রাপ্তির অধিকার ভূলুণ্ঠিত হবে। বিশেষ করে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে ইন্টার্নদের সাথে অমানবিক আচরণ ও পেশাদারিত্বের অভাব বড় ধরনের অসন্তোষ তৈরি করেছে, যা জেলার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য অশনিসংকেত।
বিস্তারিত তথ্যের জন্য কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল চিকিৎসক ডা. হোসেন ইমামের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কলটি রিসিভ করেনি

