রুপান্তর নিউজ রুপান্তর নিউজ
Admin
যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট ও ঋণের চাপে টালমাটাল বিশ্ব অর্থনীতি, বড় বিপর্যয়ের শঙ্কা আইএমএফের


মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য, সরকারি ঋণের ক্রমবর্ধমান চাপ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতের সম্ভাব্য অস্থিরতা, সব মিলিয়ে নতুন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতি। এখন পর্যন্ত নানা প্রতিকূলতা সামলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার তুলনায় ভালো অবস্থানে থাকলেও এই পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে বজায় রাখা কঠিন হতে পারে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির আশঙ্কা, জ্বালানি সরবরাহে নতুন করে বিঘ্ন ঘটলে এবং সরকারের হাতে সংকট মোকাবিলার আর্থিক সক্ষমতা কমে গেলে বিশ্ব অর্থনীতি তার সহনশীলতার সীমায় পৌঁছে যেতে পারে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) প্রকাশিত আইএমএফের সর্বশেষ ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুকে (ডব্লিউইও) বৈশ্বিক অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব সত্ত্বেও চলতি বছর বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি আগের পূর্বাভাসের চেয়ে সামান্য বেশি হতে পারে। তবে প্রবৃদ্ধির এই চিত্রের আড়ালে দেশগুলোর মধ্যে বৈষম্য বাড়ছে। কিছু দেশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিনিয়োগের সুফল পেলেও অন্য অনেক দেশ জ্বালানির উচ্চমূল্য, ঋণের বোঝা ও অর্থনৈতিক দুর্বলতার কারণে চাপে রয়েছে।
প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়লেও কাটছে না শঙ্কা
আইএমএফের নতুন পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে ৩ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে। গত জুলাইয়ে প্রকাশিত পূর্বাভাসে এই হার ধরা হয়েছিল ৩ শতাংশ। অর্থাৎ, চলতি বছরের প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা সামান্য বাড়িয়েছে সংস্থাটি। ২০২৭ সালের জন্য প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস অপরিবর্তিত রেখে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে রাখা হয়েছে।
তবে প্রবৃদ্ধির এই হিসাবকে বিশ্ব অর্থনীতির ঝুঁকিমুক্ত হয়ে ওঠার প্রমাণ হিসেবে দেখছে না আইএমএফ। বরং সংস্থাটির মতে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে বিভিন্ন দেশ ও প্রতিষ্ঠান যেসব বিকল্প ব্যবস্থা নিয়েছে, সেগুলোর কার্যকারিতা ধীরে ধীরে কমে আসতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলেও বিকল্প উৎস থেকে তেল সংগ্রহ, সরবরাহপথ পরিবর্তন এবং জরুরি মজুত থেকে জ্বালানি বাজারে ছাড়ার মতো পদক্ষেপ পরিস্থিতি সামাল দিতে সহায়তা করেছে। কিন্তু সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এসব ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে আগের মতো অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠবে।
আইএমএফের প্রধান অর্থনীতিবিদ সিলভানা তেনরেয়ো সতর্ক করে বলেছেন, বিশ্ব অর্থনীতি এখন পর্যন্ত প্রতিকূলতা মোকাবিলায় সক্ষমতা দেখালেও সেই সক্ষমতার সীমা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তাঁর মতে, কেবল তাৎক্ষণিক সংকট সামাল দেওয়ার চেষ্টা যথেষ্ট নয়। ভবিষ্যতের ধাক্কা মোকাবিলায় অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করা এবং সরকারের হাতে প্রয়োজনীয় আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।
জ্বালানি তেলের বাজারে নতুন অস্থিরতার আশঙ্কা
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি হলো জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে দীর্ঘদিন ধরে অস্থিরতা চলছে। এর প্রভাব পড়ছে পরিবহন, উৎপাদন, বিদ্যুৎ, খাদ্য সরবরাহ এবং ব্যবসায়িক ব্যয়ের ওপর।
তেলের দাম বাড়লে শুধু জ্বালানি আমদানির ব্যয়ই বাড়ে না, পণ্য উৎপাদন ও পরিবহনের খরচও বেড়ে যায়। এর ফলে খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। একই সঙ্গে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
আইএমএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানি বাজারে জরুরি মজুত কমে আসা এবং নতুন করে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বিশ্ব অর্থনীতিকে আরও বিপাকে ফেলতে পারে। বিশেষ করে তেল ও গ্যাস সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোতে বিঘ্ন দেখা দিলে তার প্রভাব দ্রুত আন্তর্জাতিক বাজারে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সংস্থাটির মূল্যায়নে, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুতও সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এ পরিস্থিতি ভবিষ্যতে সরবরাহ সংকট দেখা দিলে বাজার সামাল দেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
জ্বালানি সংকটের আরেকটি বড় প্রভাব পড়তে পারে মূল্যস্ফীতিতে। তেলের দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে পণ্য ও সেবার উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো সেই বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দিলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ আরও বাড়তে পারে।
মূল্যস্ফীতি কমতে সময় লাগবে
বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসার প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে আইএমএফ। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্বব্যাপী ভোক্তা মূল্যস্ফীতির গড় হার ৪ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে। ২০২৭ সালে তা কমে ৪ দশমিক ১ শতাংশে নামতে পারে।
তবে আগের পূর্বাভাসের তুলনায় আগামী বছরের মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা বেশি হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। অর্থাৎ, মূল্যস্ফীতি কমার প্রক্রিয়া চললেও তা প্রত্যাশার চেয়ে ধীর হতে পারে।
মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য সুদের হার নির্ধারণ আরও কঠিন হয়ে উঠবে। একদিকে সুদের হার বেশি রাখলে ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়ে, কমে যেতে পারে ব্যবসায়িক বিনিয়োগ ও ভোক্তাদের ব্যয়। অন্যদিকে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে যথাসময়ে ব্যবস্থা না নিলে পণ্যমূল্য আরও বাড়তে পারে।
এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সতর্ক অবস্থানে থাকার পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির মতে, সাময়িকভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়লেই অতিরিক্ত কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নয়। তবে মূল্যবৃদ্ধি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি রাখতে হবে।
সরকারি ঋণ বাড়ায় সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা কমছে
বিশ্ব অর্থনীতির আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো বিভিন্ন দেশের সরকারি ঋণ ও বাজেট ঘাটতি। অর্থনৈতিক সংকটের সময় সরকার সাধারণত ভর্তুকি, আর্থিক সহায়তা ও বিভিন্ন প্রণোদনার মাধ্যমে নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ঋণের বোঝা বেশি থাকলে এসব পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়।
আইএমএফের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, অনেক দেশের সরকারি ঋণ ও বাজেট ঘাটতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে নতুন সংকট দেখা দিলে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সহায়তা দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত আর্থিক সক্ষমতা নাও থাকতে পারে।
বিশেষ করে জ্বালানির দাম আরও বেড়ে গেলে সরকারগুলোর ওপর ভর্তুকি দেওয়ার চাপ বাড়বে। একই সঙ্গে ঋণের সুদ পরিশোধে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয় করার সুযোগ কমে যেতে পারে।
এ অবস্থায় সরকারি অর্থব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির মতে, শুধু তাৎক্ষণিক সমস্যা সমাধানের দিকে নজর না দিয়ে সরকারগুলোকে এমন পরিকল্পনা নিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক সক্ষমতা বজায় থাকে।
এআই বিনিয়োগে ভর করেই এগোচ্ছে অর্থনীতির একাংশ
বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এ খাতে বিপুল বিনিয়োগের কারণে প্রযুক্তি অবকাঠামো, ডেটা সেন্টার, কম্পিউটার চিপ এবং সংশ্লিষ্ট পণ্য ও সেবার চাহিদা বেড়েছে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে কয়েকটি উন্নত অর্থনীতি এবং এআই প্রযুক্তির সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত দেশগুলোর ওপর।
আইএমএফের বিশ্লেষণে, এআই অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিকে সমর্থন দিচ্ছে। বিশেষ করে প্রযুক্তি খাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত কিছু দেশ এই বিনিয়োগের মাধ্যমে বাড়তি অর্থনৈতিক সুবিধা পাচ্ছে।
কিন্তু এই সুবিধা সব দেশের মধ্যে সমানভাবে বণ্টিত হচ্ছে না। যেসব দেশ এআই প্রযুক্তির উৎপাদন, অবকাঠামো কিংবা সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত, তারা তুলনামূলকভাবে বেশি লাভবান হচ্ছে। অন্যদিকে, এসব খাতের সঙ্গে কম যুক্ত দেশগুলো জ্বালানি সংকট ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাব বেশি অনুভব করছে।
বিশ্ব অর্থনীতির এই অসম প্রবৃদ্ধির চিত্র তুলে ধরে আইএমএফ জানিয়েছে, বর্তমানে মাত্র ৩২টি দেশ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ৯৫ শতাংশের জন্য অবদান রাখছে। গত এপ্রিলে এই সংখ্যাটি ছিল ৫৪। অর্থাৎ, বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ক্রমেই অল্পসংখ্যক দেশের মধ্যে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে এআই প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের সুফল কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। প্রযুক্তির ব্যবহার প্রত্যাশিত উৎপাদনশীলতা না বাড়াতে পারলে কিংবা এ খাতের মুনাফা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পূরণ না হলে বড় ধরনের আর্থিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
এআই বাজারে ধস নামলে বিশ্ব অর্থনীতিতেও পড়বে প্রভাব
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিনিয়োগের দ্রুত বিস্তার যেমন প্রবৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নতুন ঝুঁকিও তৈরি করছে।
আইএমএফের আশঙ্কা, এআই প্রযুক্তি থেকে প্রত্যাশিত মুনাফা ও উৎপাদনশীলতা না এলে বিনিয়োগকারীরা প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ মূল্যায়ন নতুন করে বিবেচনা করতে পারেন। এর ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম কমে যাওয়া, বিনিয়োগ হ্রাস এবং আর্থিক বাজারে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংস্থাটির একটি ঝুঁকিভিত্তিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এআই খাতে বিনিয়োগে বড় ধরনের পতন ঘটলে ২০২৮ সালের মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতির উৎপাদন ১ দশমিক ১ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। একই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উৎপাদন ১ দশমিক ৮ শতাংশ পর্যন্ত কমার আশঙ্কা রয়েছে।
এটি আইএমএফের মূল পূর্বাভাস নয়, বরং এআই বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল না এলে কী ধরনের নেতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, তার একটি সম্ভাব্য হিসাব।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে শুধু প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। এআই অবকাঠামোর জন্য যেসব প্রতিষ্ঠান ঋণ নিয়েছে, তাদের আর্থিক সক্ষমতাও চাপে পড়তে পারে। পাশাপাশি শেয়ারবাজারে দরপতন হলে বিনিয়োগকারীদের সম্পদের মূল্য কমে যেতে পারে, যা ভোক্তা ব্যয় ও ব্যবসায়িক বিনিয়োগকে আরও দুর্বল করতে পারে।
ফলে প্রযুক্তি খাতে শুরু হওয়া অস্থিরতা একপর্যায়ে অন্যান্য খাতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ কারণেই এআই বিনিয়োগের সম্ভাবনার পাশাপাশি এর আর্থিক ঝুঁকিগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছে আইএমএফ।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের প্রবৃদ্ধিতে ভিন্ন চিত্র
প্রধান অর্থনীতিগুলোর প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসেও ভিন্নতা রয়েছে। আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ২০২৬ ও ২০২৭ সালে ২ দশমিক ৩ শতাংশ হারে বাড়তে পারে। ব্যক্তিগত ভোগব্যয়, করছাড় এবং এআই খাতে বিনিয়োগ দেশটির অর্থনীতিকে সহায়তা করছে।
অন্যদিকে, ইউরোজোনের ২০২৬ সালের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস জুলাইয়ের ০ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ দশমিক ১ শতাংশ করা হয়েছে। এআই খাতে বিনিয়োগ, সংশ্লিষ্ট সরবরাহব্যবস্থায় অংশগ্রহণ এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধিকে এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চীনের ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ২০২৭ সালের জন্য ৪ শতাংশ। তবে জ্বালানির উচ্চমূল্য দেশটির অভ্যন্তরীণ চাহিদার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
অন্যদিকে, ভারতের অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ ও ২০২৭, দুই বছরেই দেশটির প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ হতে পারে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা, সেবা খাতের কার্যক্রম এবং প্রযুক্তিনির্ভর বিনিয়োগ ভারতের অর্থনৈতিক সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখছে।
এই পূর্বাভাসগুলো থেকে স্পষ্ট, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে একই সময়ে প্রবৃদ্ধি ও ঝুঁকি পাশাপাশি চলছে। কিছু দেশ প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার কারণে এগিয়ে থাকলেও অন্য দেশগুলো জ্বালানি ব্যয়, দুর্বল চাহিদা ও ঋণের চাপে পিছিয়ে পড়ছে।
যুক্তরাজ্যের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়াল আইএমএফ
বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তার মধ্যেও যুক্তরাজ্যের জন্য কিছুটা ইতিবাচক খবর দিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটি ২০২৬ সালে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ দশমিক ৩ শতাংশ করেছে। জুলাইয়ের পূর্বাভাসের তুলনায় এটি ০ দশমিক ৩ শতাংশ পয়েন্ট বেশি।
তবে এই উন্নতির অর্থ এই নয় যে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতির সব সমস্যা কেটে গেছে। আইএমএফের মতে, জ্বালানির উচ্চমূল্য ও দীর্ঘমেয়াদি সুদের হার বাড়তে থাকলে ২০২৭ সালে দেশটির প্রবৃদ্ধি কমে ১ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে।
অর্থাৎ, চলতি বছরের জন্য পূর্বাভাস বাড়লেও আগামী বছর অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের গতি কিছুটা কমার আশঙ্কা রয়েছে। উচ্চ জ্বালানি ব্যয় পরিবারগুলোর ক্রয়ক্ষমতা কমাতে পারে এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে নতুন বিনিয়োগের বিষয়ে সতর্ক করে তুলতে পারে।
সামনে কী অপেক্ষা করছে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য?
আইএমএফের সামগ্রিক মূল্যায়ন হলো, বিশ্ব অর্থনীতি এখনো বড় ধরনের বিপর্যয় এড়িয়ে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু এই পরিস্থিতিকে স্থায়ী বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে, জ্বালানি সরবরাহে নতুন বিঘ্ন দেখা দিলে কিংবা এআই খাতের বিনিয়োগে বড় ধরনের ধস নামলে বর্তমান পূর্বাভাসের চেয়ে খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে চরম আবহাওয়া, সাইবার হামলা এবং সরকারি ঋণের ব্যয় বেড়ে যাওয়াও অর্থনৈতিক ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
আইএমএফের মতে, এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারগুলোকে আর্থিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে, জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সতর্ক থাকতে হবে। পাশাপাশি এআই প্রযুক্তির সুফল যাতে বৃহত্তর অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে, সেই পরিবেশও তৈরি করা জরুরি।
সব মিলিয়ে, বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সামান্য বাড়লেও সামনে অনিশ্চয়তা কমেনি। বরং জ্বালানি সংকট, ঋণের চাপ এবং প্রযুক্তি খাতের সম্ভাব্য অস্থিরতা মোকাবিলায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলানো আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
Sources: The Guardian, Reuters, International Monetary Fund (IMF)


